রাজশাহী ব্যুরো | আবুল হাশেম
রাজশাহীতে সরকারি রাস্তা দখল করে নির্মিত একটি বহুতল বিপণি বিতান এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শামসুজ্জামান আওয়াল নিয়ম ভেঙে এই মার্কেট নির্মাণ করেন এবং বর্তমানে আত্মগোপনে থাকলেও অবৈধভাবে মার্কেট থেকে বিপুল আর্থিক সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন।
নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেববাজার এলাকায় অবস্থিত ‘বৈশাখী মার্কেট’ নামে পরিচিত এই বহুতল ভবনটি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বের কথা বলে নির্মাণ করা হলেও বরাদ্দ ও ভাড়া উত্তোলন কার্যক্রম এককভাবে শামসুজ্জামান আওয়ালের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত আওয়াল ২০১২ সালে কোনো দরপত্র ছাড়াই যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই মার্কেট নির্মাণের কাজ পান। লিটনের প্রথম মেয়াদকালে কাজ শেষ না হলেও ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। শর্ত অনুযায়ী ওই স্থানে আগে থেকে যারা ব্যবসা করতেন, তাদের বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন কাজ ঝুলে থাকায় ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
২০১৩ সালের ২৭ জুন রাজশাহীর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দায়ের করা এক মামলায় অভিযোগ করা হয়, সাহেববাজার কাঁচাবাজারে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত সরকারি রাস্তা দখল করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এই মার্কেট নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৫৯৯৬ নম্বর দাগে মার্কেট নির্মাণের অনুমতি থাকলেও পরে ৫৯৪৩ নম্বর দাগভুক্ত সরকারি রাস্তা কোনো অধিগ্রহণ কিংবা বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা ছাড়াই মার্কেটের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া, পুরো মার্কেট নির্মাণে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) কাছ থেকে নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং সরকারিভাবে রাস্তা বন্ধের কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি—যা স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন। মামলায় শামসুজ্জামান আওয়াল ছাড়াও তৎকালীন রাসিক মেয়র, সচিব, আরডিএ ও জেলা প্রশাসনকে বিবাদী করা হয়। মামলার বাদী ছিলেন রফিকুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম ও সালাহউদ্দিন।
বাদীদের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর তাদের ওপর বিভিন্ন সময় চাপ প্রয়োগ করা হলেও তারা মামলা প্রত্যাহার করেননি। তাদের দাবি, তৎকালীন প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এবং মেয়র লিটনের প্রত্যক্ষ মদদে আওয়াল নির্মাণকাজ চালিয়ে যান। এর ফলে সরকারি রাস্তাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং নগরবাসীকে কাঁচাবাজারে যেতে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়।
এই মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেকেন্দার আলী জানান, মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে এবং আগামী মার্চ মাসে পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত আছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর শামসুজ্জামান আওয়াল রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় তার নিজ বাসায় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বৈশাখী মার্কেটের বরাদ্দ ও ভাড়া আদায় কার্যক্রম তার নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে। সরেজমিনে মার্কেট ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে তার ভাই রুবেল এসব দেখভাল করছেন।
২০২১ সালে মার্কেটের একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও অধিকাংশ অংশ এখনো আওয়ালের দখলে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যবসায়ীরা জানান, রুবেল ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা আপাতত কোনো সমস্যার মুখে পড়েননি। তবে পুলিশের খাতায় আওয়াল পলাতক থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তিনি গোপনে রাজশাহী ও ঢাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, শুধু এই মার্কেট নয়—রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অন্তত আরও চারটি বহুতল মার্কেট নির্মাণে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে আওয়ালের বিরুদ্ধে। একটি মার্কেটে দোকান বরাদ্দের জন্য অর্থ প্রদান করেও এক দশক পার হলেও ব্যবসায়ীরা দোকান বুঝে পাননি। অপর একটি মার্কেটের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে শামসুজ্জামান আওয়ালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তার ভাই রুবেল দাবি করেন, তিনি আওয়ালের বর্তমান অবস্থান জানেন না। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, মার্কেটের সব কার্যক্রম নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।