শাহিন হাওলাদার, বাকেরগঞ্জ | সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মানবেন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং বেসরকারি ক্লিনিকে প্র্যাকটিসসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে ‘কমিশন বাণিজ্যে’র অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্টে বাকেরগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই ডা. মানবেন্দ্র দাস কর্মস্থলে অনিয়মিত। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি বরিশাল শহরে বসবাস করেন এবং প্রতিদিন বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে এসে দেড়টার মধ্যেই ত্যাগ করেন। ফলে দুপুরের পর হাসপাতালের ইনডোর ও জরুরি বিভাগ অভিজ্ঞ চিকিৎসকশূন্য হয়ে পড়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, বিকেলে গুরুতর রোগী এলে তাকে দেখার মতো দায়িত্বশীল কেউ না থাকায় বাধ্য হয়ে রোগীদের বরিশাল শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
ভুক্তভোগী রোগী লামিয়ার স্বজন জানান, "হাসপাতালে ডাক্তার পাওয়া যায় না, কিন্তু বিকেলে ঠিকই বরিশালের ক্লিনিকে উনাকে রোগী দেখতে দেখা যায়।" অপর এক রোগী মনোয়ারা বেগম জানান, সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে গেলে ডাক্তার তাকে বরিশালের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
অভিযোগ রয়েছে, ডা. মানবেন্দ্র বরিশাল শহরের একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে চুক্তিবদ্ধ। রোগীদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে তিনি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ করেন।
পাশাপাশি তার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাচিপের (আওয়ামী পন্থী চিকিৎসক সংগঠন) প্রভাব খাটিয়ে এডহক ভিত্তিতে তার নিয়োগ হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই নিয়োগের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। এই বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর বরিশাল জেলা শাখার এক নেতা জানান, "যদি অবৈধভাবে বা প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ হয়ে থাকে, তবে তা তদন্ত করে বাতিল করা উচিত। সরকারি সেবায় এমন অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না।"
বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুমি আক্তার বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন,
"নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি সত্য। এখানে আবাসিক সংকটও রয়েছে। তবে এর ফলে সাধারণ রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।"
বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,
"সরকারি চাকরি করতে হলে কর্মস্থলে থাকা বাধ্যতামূলক। দায়িত্বকালীন সময়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা বা কমিশন খাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আরএমও পদের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক হাসপাতালে থাকা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মানবেন্দ্র দাস ক্ষুব্ধ হয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন,
"সাংবাদিক দেখলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। যত অনিয়ম আপনারা করেন, দোষ চাপান আমাদের ওপর। আমার বিষয় দেখার জন্য কর্তৃপক্ষ আছে, এটা আপনাদের বিষয় না।"