নিজস্ব প্রতিবেদক, শেরপুর:
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে বন্যহাতি ও মানুষের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নিরসনে বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘হাতি বাঁচলে, বাঁচবে গারোপাহাড়’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার বালিজুরি গ্রামের খাড়ামোড়া কোচপল্লীতে এই সভার আয়োজন করা হয়।
নাগরিক প্ল্যাটফরম জনউদ্যোগ শেরপুর কমিটি এই সভার আয়োজন করে। এতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইইডি, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি এবং শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব।
জনউদ্যোগের আহ্বায়ক শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সভায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। বালিজুরি এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত সাবেক ইউপি সদস্য জহুরুল হক, কৃষক আবুল হোসেন ও কৃষাণী পপি রানী কোচ জানান, পাহাড়ে খাবারের সংকট থাকায় ধান ও আম-কাঁঠালের মৌসুমে হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসে।
তারা জানান:
হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
গত কয়েকদিন আগেই বালিজুরি এলাকায় বন্যহাতির আক্রমণে একজন নিহত এবং দুটি বাড়ির চারটি ঘর চুরমার হয়েছে।
হাতির ভয়ে অনেক পরিবার ভিটেবাড়ি ফেলে অন্যত্র চলে গেছে।
এলাকাবাসী হাতি তাড়ানোর জন্য উচ্চ ক্ষমতার টর্চলাইট এবং মশাল জ্বালানোর জন্য সরকারিভাবে বিনামূল্যে কেরোসিন তেলের দাবি জানিয়েছেন।
মতবিনিময় সভায় জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাদির ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বন্যহাতিকে উত্যক্ত না করে হাতির সাথে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দ্বন্দ্ব কমাতে তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন:
পাহাড়ে হাতির খাবারের উপযোগী বৃক্ষরোপণ ও পানির আধার (পুকুর) তৈরি করা।
সীমান্তে হাতির পছন্দের খাবারের পরিবর্তে মরিচ বা এই জাতীয় ফসল চাষ করা।
মৌমাছি চাষের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করা।
বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা বন্ধ করা।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুজ্জামান, সাংবাদিক হাকিম বাবুল, শিক্ষক আসাদুজ্জামান রুপম প্রমুখ।
বনবিভাগের তথ্যমতে, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী সীমান্তে গত ১৬ বছরে (২০১৪ থেকে বর্তমান) হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৪৬ জন মানুষের। এর বিপরীতে ৩৪টি হাতি মারা গেছে, যার বেশিরভাগই হয়েছে গুলি, ধারালো অস্ত্র কিংবা বিদ্যুতের ফাঁদে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি শ্রীবরদীতে এক ব্যক্তি নিহত হন এবং ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নালিতাবাড়ীতে বিদ্যুতের ফাঁদে একটি মাদি হাতির মৃত্যু হয়।