
মোঃ বেল্লাল হোসাইন নাঈম, স্টাফ রিপোর্টার:
নোয়াখালীর বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর স্কুলছাত্রী তাসনিয়া হোসেন অদিতা (১৪) হত্যা মামলায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। পাষণ্ড সাবেক গৃহশিক্ষক আব্দুর রহিম ওরফে রনিকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল ২০২৬) দুপুর সোয়া ১টার দিকে নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ খোরশেদুল আলম শিকদার জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আব্দুর রহিম রনি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পরিচয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুর রহিম রনি (৩৩) নোয়াখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীনারায়ণপুর মহল্লার লাতু কাউন্সিলরের বাড়ির খলিল মিয়ার ছেলে। সে পেশায় একজন গৃহশিক্ষক ছিল এবং নিহত অদিতাকে এক সময় বাড়িতে পড়াত।
লোমহর্ষক সেই হত্যাকাণ্ড মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকে নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার ‘জাহান মঞ্জিল’ নামক নিজ বাসা থেকে অদিতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘাতক রনি অত্যন্ত নৃশংসভাবে কিশোরী অদিতার গলা কেটে এবং হাত ও পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো জেলায় চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
ঘটনার দিন রাতেই পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অদিতার সাবেক গৃহশিক্ষক রনিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় রনির শরীরে ধস্তাধস্তির একাধিক আঁচড় এবং তার পোশাকে রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে রনি হত্যার দায় স্বীকার করে এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা, বালিশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যার নেপথ্য কারণ আদালত ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অদিতা মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিল। সে রনির কাছে পড়া বন্ধ করে অন্যত্র কোচিং শুরু করায় রনি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। ঘটনার দিন অদিতার মা (যিনি একজন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা) বাসায় না থাকার সুযোগে দুপুরে রনি কৌশলে বাসায় প্রবেশ করে। সে অদিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। নিজের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবং পৈশাচিক জিঘাংসা থেকে সে অদিতাকে নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করে। ঘটনাটিকে ডাকাতির রূপ দিতে রনি ঘরের জিনিসপত্র ও আলমারি এলোমেলো করে রেখেছিল।
ন্যায়বিচার ও জনপ্রতিক্রিয়া ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. সেলিম শাহী রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ৪১ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষ ৫ জন সাক্ষী উপস্থাপন করেছে। তথ্য-প্রমাণ ও জবানবন্দি বিচার বিশ্লেষণ করে আদালত সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন। এই রায়ের মাধ্যমে দেশে যে আইনের শাসন আছে এবং অপরাধী পার পায় না, তা আবারও প্রমাণিত হলো।"
অদিতা নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নোয়াখালীসহ দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। রায় ঘোষণার পর অদিতার মা রাজিয়া সুলতানা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, "আমার বুক যে খালি হয়েছে তা পূরণ হবে না, তবে এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন দ্রুত যেন এই নরপিশাচের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।"
এই রায়ের ফলে দীর্ঘ দিন পর একটি সফল বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটলো। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এমন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা ভবিষ্যতে এই ধরণের জঘন্য অপরাধ রোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।