
মাহফুজুর রহমান সাইমন, শেরপুর:
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম কৃষিপ্রধান জেলা শেরপুর। এই জেলার সবজি চাষের সুখ্যাতি এখন দেশজুড়ে। বিশেষ করে শেরপুর সদর উপজেলার কুসুমহাটি বাজারটি বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সবজির মোকাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আঞ্চলিক অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্রে প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ, যেখানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার সবজি কেনাবেচা হচ্ছে।
প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কুসুমহাটি বাজার এলাকায় মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে। সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ছাড়াও নকলা, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত টাটকা সবজি নিয়ে এখানে হাজির হন। পিকআপ ভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও ট্রাকে করে আসা হরেক রকমের শাকসবজিতে ভরে ওঠে পুরো বাজার এলাকা।
মোকাম ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে আলু, টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, কাঁচামরিচসহ মৌসুমি সবজির বিশাল সমাহার। প্রতিদিন কয়েকশ’ মণ শাকসবজি এখানে আমদানি হয়। পাইকার ও আড়তদারদের হাকডাকে বাজার জমজমাট থাকে সারাদিন। কৃষকদের মতে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কম থাকায় তারা সরাসরি পাইকারদের কাছে পণ্য বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।
কুসুমহাটি বাজারে প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার বেশি লেনদেন কেবল কৃষি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্থানীয় সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাত, লোড-আনলোড শ্রমিক, প্যাকেজিং ব্যবসা এবং খুচরা বাজারের সাথে যুক্ত কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার সবজি স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বড় বড় ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে।
শেরপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নীলু জানান, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৯ হাজার ১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির আবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, "শেরপুরে সারা বছরই কোনো না কোনো সবজি উৎপাদিত হয়। কৃষকেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন এবং কুসুমহাটি বাজারের মতো বড় মোকাম থাকায় তারা পণ্যের সঠিক দাম পাচ্ছেন।"
বাজারের পরিধি ও গুরুত্ব বাড়লেও কিছু সমস্যার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বাজারের শেড সংখ্যা বৃদ্ধি করা, বৃষ্টির দিনে কাদা এড়াতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যাতায়াতের রাস্তা আরও প্রশস্ত করা জরুরি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে কুসুমহাটি মোকাম থেকে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের সবজি সরবরাহ চেইনে এটি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
শেরপুরের এই সবজি মোকামটি প্রমাণ করছে যে, সঠিক বাজারজাতকরণ সুবিধা পেলে গ্রামীণ অর্থনীতি কতটা দ্রুত বদলে যেতে পারে। কৃষকের ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে কুসুমহাটি বাজার আজ জেলা তথা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অনন্য প্রতীক।