
মাহফুজুর রহমান সাইমন, শেরপুর জেলা প্রতিনিধি: শেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক গৃহবধূকে প্রলোভন দেখিয়ে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে এক নার্সের বাসায় গোপনে ডিএনসি করানোর পর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহত ওই গৃহবধূর নাম লাভনী আক্তার (২৬)। গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে সদর হাসপাতাল এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে দালাল চক্র ও অসাধু স্বাস্থ্যকর্মীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: নিহত লাভনী আক্তার শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার খড়খড়িয়া তালুকদার বাড়ি গুণাপাড়া এলাকার সাইদুর রহমানের স্ত্রী। বর্তমানে তিনি স্বামীর সঙ্গে জেলা শহরের কসবা কাঠঘর এলাকায় বসবাস করতেন। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
পরিবারের অভিযোগ: লাভনীর স্বামী ফল ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম জানান, অসুস্থ অবস্থায় লাভনীকে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় মহসিন নামে এক দালালের খপ্পরে পড়েন তারা। মহসিন তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, হাসপাতালের বিপরীতে চম্পা নামের এক নার্সের বাসায় উন্নত ব্যবস্থা আছে এবং সেখানে রক্ত ছাড়াই অত্যন্ত কম খরচে ডিএনসি করা সম্ভব।
সাইদুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দালাল মহসিনের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে সকালে আমরা লাভনীকে হাসপাতাল থেকে বের করে নার্স চম্পার বাসায় নিয়ে যাই। সেখানে ডিএনসি করার পর চম্পা আমাদের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নেন। আমি রক্ত লাগবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন কোনো প্রয়োজন নেই। এরপর কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে আমাদের বিদায় করে দেন।"
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া: ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, ডিএনসি শেষে লাভনীকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে বিকেলের দিকে নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি। অবস্থা বেগতিক দেখে পুনরায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে লাভনী আক্তার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
হাসপাতাল ও প্রশাসনের বক্তব্য: শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. নাবিদ আনজুম সিয়াম বলেন, "রোগীটিকে যখন আমাদের কাছে আনা হয়, তখন তার শরীরে প্রাণের কোনো স্পন্দন ছিল না। সম্ভবত হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।" তিনি আরও জানান, গাইনি বিশেষজ্ঞ দেখানোর আগেই স্বজনরা রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র ছাড়াই নিয়ে গিয়েছিলেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) তাহেরাতুল আশরাফি বলেন, "যেহেতু ডিএনসি হাসপাতালের বাইরে হয়েছে, তাই এর দায় হাসপাতালের ওপর বর্তায় না। তবে নার্স চম্পার সম্পৃক্ততার বিষয়ে আমরা গুরুত্বের সাথে খোঁজ নিচ্ছি এবং সত্যতা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা জানান, "আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছি। নার্সের বাসায় অবৈধভাবে ডিএনসি করানোর বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি, তবে অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এলাকায় চাঞ্চল্য: একজন সরকারি নার্স কীভাবে নিজ বাসায় অবৈধভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার চালান এবং দালাল চক্র কীভাবে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেয়, তা নিয়ে শহরজুড়ে তোলপাড় চলছে। নিহতের স্বজনরা দোষী নার্স চম্পা ও দালাল মহসিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।