
মোঃ বেল্লাল হোসাইন নাঈম, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকৃতি ও সময় মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনার জন্ম দেয়, যা রূপালী পর্দার কাল্পনিক কাহিনীকেও হার মানায়। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ঠিক তেমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হলেন এলাকাবাসী। দীর্ঘ ৫৪ বছর আগে সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া জেলে ছৈয়দ আহাম্মদ (৮৩) বৃদ্ধ বয়সে ফিরে পেয়েছেন তার ভিটেমাটি ও আপনজনদের। যাকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেই মৃত ভেবে আশা ছেড়ে দিয়েছিল পরিবার, তার আকস্মিক ফিরে আসায় এলাকায় বইছে যেমন আনন্দের বন্যা, তেমনি তৈরি হয়েছে আইনি ও পারিবারিক জটিলতা।
ঘটনার শুরু প্রায় পাঁচ দশক আগে। তখন টগবগে যুবক ছৈয়দ আহাম্মদ জীবিকার তাগিদে কুতুবদিয়া উপকূলে মাছ ধরতে গিয়ে ভয়াবহ ট্রলারডুবির কবলে পড়েন। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যান তিনি। স্বজনরা দিনের পর দিন খোঁজ করেও তার কোনো হদিস পাননি। এক পর্যায়ে তারা ধরে নেন ছৈয়দ আহাম্মদ আর বেঁচে নেই। ইসলামি শরিয়ত মতে তার জানাজা ও দোয়া-খায়ের সম্পন্ন করে পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করে। কিন্তু নিয়তি তাকে লিখে রেখেছিল অন্য এক দীর্ঘ প্রবাস জীবনের জন্য।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেই দুর্ঘটনার পর ছৈয়দ আহাম্মদ কোনোভাবে ঢেউয়ের তোড়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে দীর্ঘ ৫৪ বছর তিনি ভারতের বিভিন্ন এলাকায় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জীবন অতিবাহিত করেন। স্মৃতিতে নিজের দেশের নাম থাকলেও সঠিক যোগাযোগের অভাবে তিনি ফিরতে পারছিলেন না। সম্প্রতি ভারতের হাওড়া স্টেশন এলাকায় তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারান। এরপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে উদ্ধার করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার পর তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
গত মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচবিঘা গ্রামের ফজলি বাড়িতে হাজির হন জীর্ণশীর্ণ এক বৃদ্ধ। তিনি নিজেকে সেই ৫৪ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ছৈয়দ আহাম্মদ বলে দাবি করেন। প্রথমে বিষয়টি গ্রামের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা এবং তার দীর্ঘদিনের পরিচিত আত্মীয়-স্বজনরা তাকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই বৃদ্ধকে এক নজর দেখতে হাজারো উৎসুক মানুষ ভিড় জমান। ৫৪ বছর পর বাবার মুখ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার ছেলে মো. আকরাম (৫৩), যিনি বাবার নিখোঁজ হওয়ার সময় ছিলেন এক দুগ্ধপোষ্য শিশু।
তবে এই অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের আনন্দ ম্লান হয়ে পড়েছে নতুন এক পারিবারিক দ্বন্দ্বে। ছৈয়দ আহাম্মদের ফিরে আসার পর তার থাকা-খাওয়া এবং পারিবারিক সম্পদ নিয়ে স্বজনদের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ছেলে আকরামের অভিযোগ, তার বাবাকে বর্তমানে তার চাচাতো ভাইয়েরা নিজ হেফাজতে রেখেছেন এবং তাকে ছেলের কাছে আসতে দিচ্ছেন না। পারিবারিক সম্পদ ও সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি পক্ষ তাকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে বলে দাবি আকরামের।
এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার (৮ মে) ছেলে মো. আকরাম বাদী হয়ে হাতিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এতে তিনি তার বাবাকে নিজ হেফাজতে নিয়ে সেবা করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন জানান, "বৃদ্ধের ছেলে আকরাম পুলিশকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে তার বাবা ফিরে আসার পর তার চাচাতো ভাইদের কাছে উঠেছেন। সামাজিক সিদ্ধান্তে তাকে ছেলের কাছে থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও চাচাতো ভাইয়েরা তা মানছেন না। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি এবং বৃদ্ধের নিরাপত্তা ও সঠিক আশ্রয়ের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
৫৪ বছর পর ফিরে আসা এই বৃদ্ধকে নিয়ে বর্তমানে পুরো হাতিয়ায় চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের অবসান ঘটলেও শেষ বয়সে ছৈয়দ আহাম্মদ তার আপন সন্তানের বুকে আশ্রয় পাবেন কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
