
আশিকুর রহমান, গাজীপুর: গাজীপুরের টঙ্গী রেল স্টেশন এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত ও ছিন্নমূল শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে মানবিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “ইচ্ছের হাসি প্রাথমিক বিদ্যালয়”। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (১৫ মে ২০২৬) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিদ্যালয়টির নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, গণমাধ্যমকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৫৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোহাম্মদ আলী, দৈনিক নওরোজ পত্রিকার মফস্বল সম্পাদক মনসুর আহম্মেদ, সাংবাদিক উন্নয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অলিদুর রহমান অলি, সিনিয়র সাংবাদিক মো. বশির আলম এবং টঙ্গী রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শেখ কামরুল হাসান সাহা। এছাড়াও টঙ্গী রিপোর্টার্স ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান মহসিন, সাপ্তাহিক ঝুমুর-এর সম্পাদক মাসুদ আলম, সাংবাদিক সাকিল ও আক্তার ঢালিসহ স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিত্বরা এতে অংশ নেন।
পাঠদান কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত শিশুদের শিক্ষার মূল ধারায় নিয়ে আসা সমাজের প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। এই শিশুদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে সামাজিক সংগঠন, সচেতন মহল ও বিত্তবানদের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাজীপুর মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী বলেন, "সমাজের পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ এবং মানবিক উদ্যোগ। এমন কার্যক্রমে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা উচিত।"
দৈনিক নওরোজ-এর মফস্বল সম্পাদক মনসুর আহম্মেদ তার বক্তব্যে বলেন, "শিক্ষাই পারে একটি শিশুর জীবন এবং ভাগ্য বদলে দিতে। ‘ইচ্ছের হাসি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর মতো উদ্যোগগুলো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এবং অপরাধ প্রবণতা কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।"
দৈনিক খবরপত্র-এর সিনিয়র সাংবাদিক বশির আলম বলেন, "ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশনের পাশে অবহেলিত ও কোমলমতি শিশুদের জন্য আলোর পথ তৈরি করে চলেছে ‘ইচ্ছের হাসি বিদ্যালয়’। মানবিক মূল্যবোধ ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা আরও সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সফল হোক।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টঙ্গী রেল স্টেশন ও আশপাশ এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ছিন্নমূল শিশুদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন থেকে ২০১৯ সালে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়। সম্পূর্ণ মানবিক তাগিদ থেকে এই অবৈতনিক বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছেন একঝাঁক উদীয়মান সমাজকর্মী। এর পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছেন 'স্মাইল' গাজীপুর জেলা শাখার সভাপতি ও যুগান্তর স্বজন সমাবেশ টঙ্গী শাখার সদস্য খাদিজা আক্তার মৌমি, স্মাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাদিম আহম্মেদ জয়, সদস্য শাওন, হোসেন এইচ আর এবং জুবায়ের আহমেদ। তাদের নিরলস ও নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টায় আজ আলোর মুখ দেখছে শত শত শিশু।
সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে অসহায় ও পথশিশুরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। শুধু প্রথাগত পাঠদানই নয়, শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ করছেন উদ্যোক্তারা। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য ও পকেটের টাকা খরচ করে তারা নিয়মিত শিশুদের খাতা, কলম, বইসহ প্রয়োজনীয় সব শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করে আসছেন।
বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা জানান, "রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি শিশুরই শিক্ষার সমান অধিকার রয়েছে। আমরা চাই, এই অবহেলিত শিশুরা যেন একদিন শিক্ষিত হয়ে সমাজের বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হয়। আমাদের এই চেষ্টা চিরকাল অব্যাহত থাকবে।"
টঙ্গী রেল স্টেশন এলাকায় গড়ে ওঠা “ইচ্ছের হাসি প্রাথমিক বিদ্যালয়”-এর এমন মানবিক ও শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগ ইতোমধ্যেই স্থানীয় সচেতন মহলের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন যদি এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়ায়, তবে এই কার্যক্রমকে আরও বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা যেমন কমবে, তেমনি আলোর মুখ দেখবে অন্ধকার গলির হাজারো ভবিষ্যৎ।