
মনজু হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার (পঞ্চগড়):
মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র তিন দিন বাকি। কোরবানিকে সামনে রেখে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ত সময় পার করছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাররা। পঞ্চগড় বাজারের ঐতিহ্যবাহী কামারপাড়ায় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে লোহা পেটানোর অবিরাম ‘টুংটাং’ শব্দ। কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই কারিগরদের।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, প্রায় অর্ধশত বছর ধরে পঞ্চগড় বাজারের কামারপাড়ায় এই কর্মযজ্ঞ চলে আসছে। বছরের অন্য সময় ব্যবসা কিছুটা মন্দা থাকলেও, প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে ঘিরে এখানে কাজের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, কামারপাড়ার ব্যস্ততা ততটাই বাড়ছে। তীব্র গরম আর আগুনের উত্তাপকে উপেক্ষা করে দিন-রাত এক করে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করছেন কামার শিল্পীরা। পুরোনো সরঞ্জাম শান দেওয়া (ধারালো করা) এবং নতুন নতুন ধারালো অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের।
কামারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির মৌসুমে কাজের চাপ ও বিক্রি বাড়লেও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগের মতো লাভ হচ্ছে না। লোহা, কয়লা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণের দাম বাজারে আকাশছোঁয়া। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে পণ্যের দাম পাচ্ছেন না তারা।
ঐতিহ্য ধরে রাখার লড়াই পঞ্চগড় বাজারের অভিজ্ঞ কামার মজিবর বলেন, “সারা বছরই আমাদের টুকটাক কাজ চলে। তবে ঈদ আসলে ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। এখন দিন-রাত পরিশ্রম করে কাস্টমারদের জিনিসপত্র তৈরি করছি। তবে আগের চেয়ে লাভ অনেক কমে গেছে।”
প্রায় ৫০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত প্রবীণ কারিগর মজিবর রহমান তাঁর মনের ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। রক্তের সাথে মিশে আছে, তাই চাইলেও এই পেশা ছাড়তে পারছি না। কিন্তু এখনকার নতুন ছেলেরা এত কষ্টের কাজ করতে চায় না। দিন দিন খাটুনি বাড়ছে কিন্তু লাভ কমছে। তাই ভবিষ্যতে এই শিল্প আদৌ টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে আমরা চরম চিন্তায় আছি।”
এদিকে কামারপাড়ায় কোরবানির জন্য ছুরি ও চাপাতি কিনতে আসা আনিছুর রহমান মানিক নামের এক ক্রেতা বলেন, “বর্তমানে বাজারে সবকিছুর দামই বাড়তি। সেই ছোঁয়া লেগেছে লোহার জিনিসপত্রেও। গত বছরের তুলনায় এবার দা, ছুরি, চাপাতির দাম একটু বেশি। তারপরও কোরবানির কাজে লাগবেই, তাই বাধ্য হয়ে একটু বেশি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং যান্ত্রিক প্রযুক্তির প্রসারে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পঞ্চগড়ে এখনো মাথা উঁচু করে টিকে আছে কামার শিল্প। তবে নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় কম মজুরি এবং উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন বড় ধরনের শঙ্কার মুখে পড়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা না পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।