
আবুল হাশেম রাজশাহী ব্যুরো | প্রকাশ: ০৮ জুলাই, ২০২৬
রাজশাহী: রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ লাইন এবং চিকিৎসকদের রাউন্ডের সময়ের সাথে রিপোর্ট ডেলিভারির সমন্বয় না থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। হাসপাতালটির এমন সমন্বয়হীনতার কারণে বৃহস্পতিবার ভর্তি হওয়া কোনো কোনো রোগীর মূল চিকিৎসা শুরু হতেই ৪ দিন পার হয়ে যাচ্ছে।
গত রবিবার সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে এবং ভুক্তভোগী রোগীদের সাথে কথা বলে চিকিৎসার নামে পদে পদে হয়রানির এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগের স্যাম্পল কালেকশন ও রিপোর্ট ডেলিভারি বিভাগের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সইবুর রহমান সাবু। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি স্ত্রী আনোয়ারা খাতুনের রিপোর্ট নিতে তিনি সকাল ১০টার আগেই এসে লাইনে দাঁড়ান। তখন তাঁর আগে আরও ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। দুপুর ১২টায় রিপোর্ট দেওয়া শুরু হলেও সাবু স্ত্রীর রিপোর্ট হাতে পান প্রায় সাড়ে ১২টায়।
তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন,
"এখন রিপোর্ট পেয়ে কী হবে? বড় ডাক্তাররা তো ওয়ার্ডে রাউন্ড দিয়ে চলে গেছেন। আবার কাল সকালে আসবেন। তাহলে আমার স্ত্রীর মূল চিকিৎসা শুরু হবে কখন? রিপোর্ট না পেলে ডাক্তাররা বুঝবেন কী করে রোগ কোন পর্যায়ে আছে?"
সাবু জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে স্ত্রীকে ভর্তি করান। শুক্রবার ছুটির দিনে ডাক্তার আসেননি। শনিবার সকালে ডাক্তার দেখে রক্ত ও এক্স-রে দেন। সেগুলো করানো হয় শনিবার দুপুরের মধ্যেই। কিন্তু সেই রিপোর্ট হাতে পান রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টায়। ততক্ষণে ডাক্তারদের রাউন্ড শেষ। এখন আবার সোমবার সকাল ৯টার রাউন্ড পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ, ভর্তির ৪ দিন পর মূল চিকিৎসা শুরু হবে।
১৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি স্ট্রোকের রোগী রইচ উদ্দিনের অবস্থাও একই। শুক্রবার ভর্তির পর শনিবার ডাক্তার তাঁকে এমআরআই করার পরামর্শ দেন। রক্ত পরীক্ষা হলেও সেদিন এমআরআই করা সম্ভব হয়নি। রবিবার সকাল সাড়ে ১১টায় মেয়ে ফাতেমা খাতুন বাবাকে ট্রলিতে করে রেডিওলোজি বিভাগে আনেন। কিন্তু এসে জানতে পারেন, সেদিন আর এমআরআই হবে না।
ফাতেমা অভিযোগ করে বলেন, "একদিনে ২০ জনের বেশি এমআরআই করা হয় না। ট্রলিম্যানকে ২০০ টাকা দিয়েও লাভ হলো না। ডাক্তার এমআরআই ছাড়া চিকিৎসা দিতে পারছেন না। কাল সকাল ৬টায় এসে লাইন ধরতে হবে। সিরিয়াল না পেলে আরও একদিন নষ্ট। তাহলে বাবার চিকিৎসা শুরু হবে কবে?"
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল কাদের শনিবার বহির্বিভাগে টিকিট কেটে ডাক্তার দেখান। ডাক্তার তাঁকে আল্ট্রাস্নোগ্রাম দেন। রিপোর্ট হাতে পান রবিবার দুপুর ১টায়। দৌড়ে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে দেখেন দেড়শ রোগীর লাইন। ডাক্তার সাঈদ সাতিল মুজতাহিদ দুপুর ২টার পর চলে যান। ফলে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয় আব্দুল কাদেরসহ আরও প্রায় ৫০ জনকে। তাঁদের বলা হয় সোমবার আবার লাইন ধরতে।
অন্যদিকে, পবার আব্দুল মজিদ শনিবার ডা. মোক্তার আলীকে দেখিয়ে রক্ত পরীক্ষা দেন। রবিবার দুপুরে রিপোর্ট পেয়ে গিয়ে জানতে পারেন ডাক্তার ছুটিতে আছেন। তাঁকে বুধবার আসতে বলা হয়েছে, অন্যথায় নতুন টিকিট কাটতে হবে।
ভোগান্তির শিকার রোগী ইসমাইল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "চিকিৎসার নামে পদে পদে হয়রানি। রিপোর্ট পেতে দেরি, ডাক্তার পেতে দেরি, আবার টিকিটের মেয়াদও শেষ। আমরা সাধারণ মানুষ যাবো কোথায়?"
সার্বিক অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন,
"রোগীর চাপ অতিরিক্ত বেশি হওয়ায় রিপোর্ট দিতে কিছুটা সময় লাগছে। এজন্য চিকিৎসাও কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে আমরা সেবা সহজ করতে রিপোর্ট ডেলিভারির জন্য আলাদা কাউন্টার করেছি এবং কাউন্টারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। চিকিৎসকদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই।"
পর্দার আড়ালের বাস্তবতা: হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরের পর যেসব রোগী ভর্তি হন, তাঁদের রিপোর্ট পেতে পেতে শনি বা রবিবার চলে যায়। আবার শনি ও রবিবারের পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে পেতে সোম বা মঙ্গলবার লেগে যায়। ফলে যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে প্রতি সপ্তাহেই ৩-৪ দিন চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে শত শত রোগীর।