(নীলফামারী) প্রতিনিধি:
তিস্তানদীর ভাঙন ও কয়েক দফা বন্যার ক্ষতি পেরিয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় এবার আমন ধানে হয়েছে বাম্পার ফলন। মাঠজুড়ে এখন সোনালি ধানের দোলা, বাতাসে দুলছে পাকা ধানের শীষ, ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ধানের সুমিষ্ট ঘ্রাণ। দীর্ঘদিনের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে কৃষকের মুখে ফিরেছে অম্লান হাসি; কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ।
চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং রোগবালাই প্রায় না থাকায় উৎপাদন হয়েছে আশাতীত। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে ধান কাটার ব্যস্ততা। কেউ কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, কেউ আবার ঘরে তোলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
কৃষকেরা জানান, মৌসুমের শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় অতিরিক্ত সেচ দিতে হয়েছে, ফলে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি কয়েক দফা বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও পরে পুনরায় রোপণ করে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পেয়েছেন। ভালো ফলন ও বাজারে সন্তোষজনক দাম—সব মিলিয়ে মুখে এখন স্বস্তির হাসি।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে ডিমলায় ২১ হাজার ২১৭ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে—যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ হেক্টর বেশি। বিশেষ করে পশ্চিম ছাতনাই, পূর্ব ছাতনাই, খগাখরিবাড়ি, টেপাখরিবাড়ি, গয়াবাড়ি, খালিশা চাপানি ও ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকায় কৃষকেরা বন্যার ধকল পেরিয়ে পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফলন।
বালাপাড়া ইউনিয়নের সুন্দরখাতা গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, “তিন বিঘা জমিতে ব্রি-৩৭ করেছি। শুরুতে খরচ বেশি ছিল, কিন্তু ফলন ও দাম দুটোই ভালো। মনে হচ্ছে পরিশ্রম সার্থক।”
একই গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, “আগে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি ধান কাটা হতো। এখন আগাম ও হাইব্রিড জাত ব্যবহারে কম সময়ে ভালো ফলন মিলছে। এতে একই জমিতে পরের ফসল লাগানো যাচ্ছে, আয়ও বাড়ছে।”
গয়াবাড়ি ইউনিয়নের শুটিবাড়ি বাজারের ধান ব্যবসায়ী আবু তাহের জানান, “নতুন ধান বর্তমানে প্রতি মণ ১,২০০–১,২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই ধান ৮৫০–৯০০ টাকায় ছিল।”
ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, “বন্যার ক্ষতি সত্ত্বেও এবার রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। আগাম ও স্বল্পমেয়াদী জাত ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বেড়েছে। একই জমিতে এখন সরিষা বা আলু চাষের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা কৃষিতে বৈচিত্র্য আনবে।”
তিনি আরও জানান, কৃষকদের সার, বীজ, কীটনাশক ও পরামর্শসহ সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। “এই সফলতা সম্পূর্ণই কৃষকদের পরিশ্রম ও সচেতনতার ফল,” যোগ করেন তিনি।
তিস্তাপাড়ের কৃষকেরা আশা করছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার ক্ষতি থাকলেও যদি এমন ফলন বজায় থাকে, তাহলে ডিমলার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এ সোনালি সাফল্য শুধু ফসলে নয়—ডিমলার কৃষি অর্থনীতিতেও এনেছে নতুন আশার আলো।