
হাবিবুর রহমান
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধিঃ
বাঙালির ইলিশের রাজ্য হিসেবে খ্যাত লক্ষ্মীপুরের রামগতি–কমলনগরের মেঘনা নদীতে মা-ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সরকারের দেওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ (২৫ অক্টোবর) শনিবার রাত ১২টায়। নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ শিকারে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন হাজারো জেলে।
গত ৩ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে শুরু হয়ে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জুড়ে জেলেদের মধ্যে ছিল নিদারুণ দুর্ভোগ। তবে নদীজুড়ে অভিযান চালানোর পরও অভিযোগ উঠেছে—কিছু প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে মা-ইলিশ নিধন চলেছে অবাধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রামগতি উপজেলা মৎস্য অফিসের সহকারী আব্দুজ্জাহের ও বড়খেরী নৌ–পুলিশ ফাঁড়ির নিয়োগকৃত দালাল ও যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ ইসমাইলের সেল্টারে ঘুষের বিনিময়ে ইলিশ শিকারের সুযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রামগতি মাছঘাট, বয়ারচর ব্রিজঘাট, গাবতলী ঘাট ও টাংকিরঘাট এলাকায় প্রতি নৌকা থেকে ১০–১৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এমনকি শেষ দুই দিনে বড়খেরী নৌ–পুলিশ ও মৎস্য অফিসের মধ্যে ‘জাটকা নিধনের প্রতিযোগিতা’ হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) অভিযান চালিয়ে কয়েকটি নৌকা আটক করা হলেও প্রতি নৌকা ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই জেলে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। কেউ নৌকা–ট্রলার ধোয়ামোছা ও জাল বুনতে ব্যস্ত, কেউবা নদীপাড়ের আড়তগুলো পরিষ্কার করছেন।
রামগতি ও কমলনগরের বিভিন্ন জেলে পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে—নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ ধরতে সবাই মুখিয়ে আছেন।
জেলে রবিউল মাঝি বলেন,
“অন্যবারের তুলনায় এবারের নিষেধাজ্ঞায় ছিল অনেক ফাঁকফোকর। অনেক জেলে নদীতে মা–ইলিশ ধরেছে। আমরা যারা নিষেধাজ্ঞা মেনেছি, তারা ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছি।”
জেলে মফিজ মাঝি জানান,
“এই ২২ দিন অনেক কষ্টে সংসার চলেছে। সরকার সামান্য কিছু চাল দেয়, তা দিয়ে নয়জনের পরিবার চলে না। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় খুশি আমরা।”
জেলে নিজাম উদ্দিন বলেন,
“তিনটা ছোট বাচ্চা, স্ত্রী আর মা—সবাই আমার রোজগারের ওপর নির্ভরশীল। নিষেধাজ্ঞার সময় এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। এখন মাছ ধরে ঋণ শোধ করব।”
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, কমলনগরে নিবন্ধিত জেলে ১৪,০৯৮ জন এবং রামগতিতে ২০,৩৬০ জন—মোট ৩৪,৪৫৮ জন জেলে এই দুই উপজেলায় জীবিকা নির্বাহ করেন।
মৎস্য অফিস জানায়, রামগতির আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার মেঘনা নদী এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষিত। এখানে ৩ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ ছিল।
কমলনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তুর্য সাহা ও রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরব–উজ জামান জানান,
“২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে শেষ হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌ–পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে প্রতিদিন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।”