
আবুল হাশেম | রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহীর গোদাগাড়ী মডেল থানার এক উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি, অভিযোগ ও মামলা তদন্তের নামে ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, টাকা ছাড়া কোনো কাজই করেন না এই পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি ঘুষ না দিলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ট্যাগ লাগিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি কিংবা অভিযোগের তদন্তে গিয়ে এএসআই ফজলু নিয়মিত অর্থ দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের ট্যাগ দিয়ে গ্রেপ্তার বা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বড় অঙ্কের টাকা না পেলে কখনো কখনো ৩০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোদাগাড়ী উপজেলার ১ নম্বর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র শেওলা গ্রামের বাদশার দায়ের করা অভিযোগের ঘটনায় এএসআই ফজলু উভয় পক্ষকে মীমাংসায় বসান। গত ১৯ ডিসেম্বর অভিযোগ নিষ্পত্তির পর অভিযুক্ত শফিকুল ইসলামের কাছ থেকে তিনি ২ হাজার টাকা গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ।
এছাড়া, একই ইউনিয়নের রাতাহারী এলাকার সোহরাব আলীর ছেলে আব্দুল খালেক জানান, গত ১৬ নভেম্বর একটি অভিযোগের তদন্তে গিয়ে এএসআই ফজলু তার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নেন। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ২০ হাজার টাকা পাওনার মধ্যে ১৫ হাজার টাকা আদায় হলেও, এর মধ্যে ২ হাজার টাকা নিজে রেখে বাদীকে দেওয়া হয় ১৩ হাজার টাকা।
চলতি বছরের ১৫ জুনে মারামারির ঘটনায় করা একটি জিডির তদন্তে আজাদ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকেও ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাতাহারী গ্রামের হাসান আলীর ছেলে আব্দুল খালেক বলেন, পারিবারিক কলহের ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর এএসআই ফজলু তদন্তে এসে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন।
আরেক ভুক্তভোগী রাতাহারী দিঘিপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে সেলিম অভিযোগ করেন, বাড়িতে বসে তালের রস পান করার সময় এএসআই ফজলু তাকে আটক করে ১ হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন।
উপজেলার মিরপুর গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ছাগলের ধান খাওয়াকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের জুন মাসে মারামারির ঘটনায় থানায় অভিযোগ হয়। সেই অভিযোগ মীমাংসার জন্য এএসআই ফজলু প্রথম দফায় ৫ হাজার টাকা এবং পরে আরও ৩ হাজার টাকা নেন।
গোদাগাড়ী ইউনিয়নের জলাহার গ্রামের বাসিন্দা শারিফ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, “এএসআই ফজলু আমার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আমাকে আওয়ামী লীগের অপবাদ দিয়ে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়। গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে সে আমার বাড়িতে এসে বারবার বিরক্ত করছে।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গোদাগাড়ী মডেল থানার এএসআই ফজলুর রহমান।
এ বিষয়ে একই এলাকার জুলাই যোদ্ধা মুরসালিন ইসলাম বলেন, “জুলাই পরবর্তী সময়ে পুলিশের ঘুষ গ্রহণ ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে টাকা দাবি করা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমি তাকে একাধিকবার সতর্ক করেছি। তারপরও সে ঘুষ নেওয়া বন্ধ করেনি। আমি তার দ্রুত প্রত্যাহার দাবি করছি।”
স্থানীয় সূত্রে আরও অভিযোগ রয়েছে, এএসআই ফজলু দীর্ঘদিন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত থাকাকালে বোষপাড়া, উপশহরসহ বিভিন্ন পুলিশ ফাঁড়িতে মাসোহারা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে সময় রাজনৈতিক দমন-পীড়নেও তার ভূমিকার অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও দাবি স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাশিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন,
“ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রমাণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”