
ফরিদ মিয়া
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩২ ধারার আলোকে ফিটনেসবিহীন ও অননুমোদিত যানবাহন চলাচল, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালনার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে এটি নিঃসন্দেহে একটি আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে হাজারো মানুষের জীবন-সংগ্রামের করুণ চিত্র। প্রশ্ন উঠেছে—এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব কার ওপর সবচেয়ে বেশি পড়বে?
আইন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়; এর সার্থকতা নির্ভর করে মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে তার সামঞ্জস্যের ওপর। ময়মনসিংহে অসংখ্য মানুষ মোটরসাইকেলকে কেবল শখের বাহন নয়, বরং উপার্জনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।
রাইড শেয়ারিং ও পণ্য পরিবহন: অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক রাইড শেয়ারিং বা ক্ষুদ্র পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে সংসার চালান।
কৃত্রিম প্রজনন কর্মী: প্রাণিসম্পদ খাতের কর্মীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গবাদিপশুর সেবা দিতে মোটরসাইকেলেই ভরসা করেন। হঠাৎ চলাচল বন্ধ হলে দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে।
মাঠকর্মী ও বিপণন: বিভিন্ন কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেন। চলাচলে বাধা এলে তাদের আয় হ্রাস পাবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাস্তবতা হলো, এই পেশাজীবীদের বড় অংশই নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। তাদের কাছে একদিন আয় বন্ধ হওয়া মানে ঘরে চুলা না জ্বলা। লাইসেন্স নবায়ন বা ফিটনেস সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় মোটা অঙ্কের অর্থ কিংবা জরিমানার টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করার সামর্থ্য অনেকেরই নেই।
“আইন প্রয়োগের লক্ষ্য কি শুধুই শাস্তি দেওয়া, নাকি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা? যদি লক্ষ্য শৃঙ্খলা হয়, তবে সেই প্রক্রিয়া হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক।”
সড়কে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ হওয়া জরুরি, কিন্তু মানুষ কেন নিয়মের বাইরে থাকে তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ চালকরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও নিচের বাধাগুলোর কারণে পিছিয়ে থাকেন:
জটিল আমলাতন্ত্র: লাইসেন্স পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা।
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য: সরকারি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি।
উচ্চ ব্যয়: লাইসেন্স ও ফিটনেস নবায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ।
শাস্তি নয়, বরং নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়তে জেলা প্রশাসনের প্রতি কিছু প্রস্তাবনা:
বিশেষ ক্যাম্পেইন: স্বল্প খরচে এবং দ্রুততম সময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস নিশ্চিত করতে ‘ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্প’ বা বিশেষ সেবা সপ্তাহ চালু করা।
সংশোধনের সুযোগ: হঠাৎ অভিযান না চালিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
আর্থিক শিথিলতা: জীবিকানির্ভর পেশাজীবীদের জন্য কিস্তিতে জরিমানা পরিশোধ বা ভর্তুকি মূল্যে লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা করা।
মানবিক তদারকি: মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের সময় চালকদের সঙ্গে সহনশীল ও সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা, তেমনি নাগরিকের জীবিকা সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের নামে যদি হাজারো পরিবার হঠাৎ আয়হীন হয়ে পড়ে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না।
নিষেধাজ্ঞা যেন কেবল অস্থায়ী আতঙ্কের কারণ না হয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অংশ হয়। আইন হোক শৃঙ্খলার হাতিয়ার, শাস্তির বোঝা নয়। আইন ও জীবিকার এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, জনদুর্ভোগ কমানোর এই উদ্যোগই হয়তো সাধারণ মানুষের জন্য নতুন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।