
হাবিবুর রহমান, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
উপকূলীয় জনপদ লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মাদকের মরণ ছোবল ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এক সময়ের শান্ত এই জনপদে এখন হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা। ফলে দ্রুত ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে এই অঞ্চলের তরুণ ও যুবসমাজ। হতাশা, বেকারত্ব, সঙ্গদোষ কিংবা নিছক কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই নেশা এখন জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি কেবল একটি নৈতিক স্খলন নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল রোগ। আধুনিক চিকিৎসায় একে বলা হয় ‘ক্রনিক রিল্যাপসিং ব্রেইন ডিজিজ’। মাদকের প্রভাবে মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন ও কাজের পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি চাইলেও সহজে এই চক্র থেকে বের হতে পারে না। এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং শরীরে হৃদরোগ, লিভার সিরোসিসসহ নানা প্রাণঘাতী শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতাশা, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার প্রবণতা।
মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির জন্য বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘বায়ো-সাইকো-সোশ্যাল’ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকমুক্ত করতে কেবল শাস্তি যথেষ্ট নয়, বরং সহমর্মিতা ও সুশৃঙ্খল চিকিৎসা প্রয়োজন।
১. শারীরিক সুস্থতা: প্রথমে ডিটক্সিফিকেশনের মাধ্যমে শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান দূর করা হয়।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা: মাদকাসক্তির মূলে থাকা ট্রমা, হতাশা বা ব্যক্তিগত অস্থিরতা নিরসনে সাইকো-থেরাপিস্ট ও কাউন্সিলররা কাজ করেন।
৩. সামাজিক পুনর্বাসন: সুস্থ হওয়ার পর সেই ব্যক্তিকে কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া এই চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কমলনগরের সচেতন মহলের দাবি, মাদকের বিস্তার রোধে কেবল প্রশাসনের অভিযানই যথেষ্ট নয়। পরিবারকে হতে হবে সন্তানের প্রথম ঢাল। সন্তানদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের বন্ধু ও চলাফেরার প্রতি নজর রাখা এবং মাদকের কুফল নিয়ে খোলামেলা আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মাদকবিরোধী প্রচারণা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা জরুরি।
মাদক চোরাচালানের ফলে এলাকায় অপরাধের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। মাদকাসক্তদের সঠিক চিকিৎসার জন্য মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। যুবসমাজকে সুস্থ ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
মাদকের এই বিষবাষ্প থেকে কমলনগরকে রক্ষা করতে না পারলে আগামী প্রজন্ম এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাই এখনই সময় ‘মাদককে না’ বলার এবং একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করার।