
মাহফুজুর রহমান সাইমন, শেরপুর:
পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে আর দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে মরুভূমির দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন মো. রনি মিয়া (৩০)। লক্ষ্য ছিল হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন এখন কফিনবন্দি। সৌদি আরবের রিয়াদে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ১১ দিন পর অবশেষে নিজ গ্রামে ফিরল রনির মরদেহ। প্রিয় মানুষকে হারিয়ে পুরো গ্রামজুড়ে এখন চলছে শোকের মাতম।
মৃত্যুর ১১ দিন পর নিথর দেহ দেশে গত ২১ এপ্রিল সৌদি আরবের রিয়াদে এক ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রনি মিয়া। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুর ১১ দিন পর গত শুক্রবার (২ মে) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তার মরদেহ দেশে এসে পৌঁছায়। শুক্রবার রাতেই বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ করে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দিঘীরপাড় পালপাড়া গ্রামে আনা হয়। শনিবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তিনি ওই এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।
গ্রামে শোকের ছায়া ও হৃদয়বিদারক পরিবেশ রনির মরদেহ গ্রামে পৌঁছামাত্রই সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা এলাকাবাসী। কান্নার রোলে ভারী হয়ে ওঠে দিঘীরপাড় গ্রামের আকাশ-বাতাস। ছেলের শোকে বাবা মো. আব্দুর রাজ্জাক ও মা মল্লিকা বেগম প্রায় বাকরুদ্ধ। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা মল্লিকা, আর নিথর দেহের পাশে নির্বাক বসে আছেন স্ত্রী দিলরুবা আক্তার।
অন্ধকার ভবিষ্যতে দুই শিশু সন্তান রনি মিয়ার দুই শিশু সন্তান—সুমাইয়া আক্তার (৭) ও মুফাসিনা আক্তার (৩)—এখনো ঠিকমতো জানে না যে তাদের বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। বড় মেয়ে সুমাইয়ার নির্বাক চাহনি আর ছোট মুফাসিনার অবুঝ কান্না দেখে উপস্থিত কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার যে স্বপ্ন রনি দেখেছিলেন, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সংগ্রামময় প্রবাস জীবন জানা গেছে, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২৪ সালে প্রথমবার ফুড ডেলিভারির কাজে সৌদি আরব গিয়েছিলেন রনি। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মাথায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়। সুস্থ হওয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে পুনরায় জীবনের চাকা ঘোরাতে সৌদি আরব পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার জীবনসংগ্রামের চিরসমাপ্তি ঘটে।
সহযোগিতার আকুতি নিহতের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি, আমার সন্তানরা এতিম হয়ে গেছে। এখন এই ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আমি কোথায় যাব, কীভাবে তাদের মানুষ করব?” তিনি শোকাতুর কণ্ঠে পরিবারের টিকে থাকার জন্য সরকারের কাছে সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন শোক প্রকাশ করে বলেন, “একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধার এভাবে মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।”
প্রকাশকাল: ২ মে, ২০২৬।