
মোঃ আমজাদ হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার:
উত্তরাঞ্চলের কৃষি সমৃদ্ধ জেলা জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার এক সময়ের গর্ব ও অর্থকরী ফসল ‘লতিরাজ’ কচু বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। উপজেলার বাগজানা, ধরঞ্জী, আয়মারসুলপুর, বালিঘাটা এবং আটাপুরসহ ৮টি ইউনিয়নে এক সময় এই কচুর ব্যাপক চাষ হলেও, সেই সোনালি দিন এখন ফিকে হয়ে আসছে। স্থানীয় চাষি ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের দাবি, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও বীজের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডটি এখন বিলুপ্তির উপক্রম।
কয়েক দশক ধরে পাঁচবিবির লতিরাজ কচু দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল এবং বিদেশেও রপ্তানি হতো। তবে বর্তমান চিত্র ভিন্ন। স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, লতিরাজ কচু চাষ কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী— মানসম্মত বীজের তীব্র সংকট, পরিবর্তিত জলবায়ু এবং বাজার ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা।
চাষিদের মতে, কয়েক বছর ধরে এই ফসলে বিভিন্ন রোগবালাইয়ের প্রকোপ বেড়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না। ফলে অনেক কৃষক লতিরাজ বাদ দিয়ে অন্য লাভজনক ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। পুরোনো পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং বাণিজ্যিক চাহিদার সাথে তাল মেলাতে না পারাও এই সংকটের অন্যতম কারণ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সুমন, জাকিরুল ও মমিজুল জানান, লতিরাজ কচুর উচ্চ ফলনশীল বীজের অভাব এবং আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তি না থাকায় এর উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া এই বিশেষ ফসলের জন্য সরকারিভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট বাজার বা পাইকারি কেন্দ্র নেই। পরিবহনের আকাশচুম্বী খরচ এবং দালাল চক্রের কারণে কৃষকরা ন্যায্য মুনাফা অর্জন করতে পারছেন না। লাভের চেয়ে ঝুঁকির পরিমাণ বেশি হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এই চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে।
কয়েকজন প্রবীণ চাষি আবেগের সাথে বলেন, “আমাদের এই সোনালি নামের কচুটা যদি হারিয়ে যায়, তবে গ্রামের হাজার হাজার মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।”
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ‘বিলুপ্তি’ শব্দটি ব্যবহার করার সময় এখনও আসেনি, তবে তারা স্বীকার করেছেন যে চাষে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বীজ সংরক্ষণ কেন্দ্র গঠন, আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাজারজাতকরণের সঠিক পথ তৈরি করতে পারলে এই জাতটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ জসিম উদ্দিন জানান:
“পূর্বের মতো লতিরাজ কচু চাষ পুনরুজ্জীবিত করতে আমরা কৃষকদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। তাদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে।”
স্থানীয় কৃষক সংগঠনের নেতারা জোর দাবি জানিয়েছেন যে, সরকারের বিশেষ নজরদারি ও প্রশিক্ষণ ছাড়া এই ঐতিহ্যবাহী ফসল রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা দ্রুত সরকারি বীজাগার স্থাপন এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন। পাঁচবিবির এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে না পারলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হবে না, বরং হারিয়ে যাবে উত্তরবঙ্গের একটি বিশেষ কৃষি ব্র্যান্ড।