
আবুল হাশেম, রাজশাহী ব্যুরো:
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রশাসন রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করেই এক ‘বিস্ময়কর’ নিয়োগ সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ ছাড়পত্র ছাড়াই রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে প্রায় ৬০ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক (ডেলি লেবার) শ্রমিককে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ও বোর্ডের নিজস্ব বিধিমালা লঙ্ঘন করে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর আ খ ম মোফাকখারুল ইসলাম এবং সচিব প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরীসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
বিধির তোয়াক্কা নেই, নেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি: অনুসন্ধানে জানা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল মামলার (নং ৩০০/২০১৫) রায় অনুযায়ী, পদ শূন্য হলে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো প্রকার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি বোর্ডের নিজস্ব প্রবিধান ‘এস আর ৬৫’-এর ২ নং ধারা অনুযায়ী সিলেকশন কমিটির সুপারিশ বাধ্যতামূলক থাকলেও এক্ষেত্রে কোনো কমিটির তোয়াক্কা করা হয়নি। সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে চেয়ারম্যান ও সচিবের কক্ষে বসেই এই নিয়োগ ও যোগদানপত্র প্রদান করা হয়েছে।
নেপথ্যে ‘মামুন’ সিন্ডিকেট ও কোটি টাকার লেনদেন: সূত্রমতে, এই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন মামুন নামের এক দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক। অভিযোগ আছে, চেয়ারম্যান ও সচিব এই মামুনের মাধ্যমেই যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ও বোর্ড সভার ভুয়া রেজুলেশন তৈরি করেছেন। বোর্ডের সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে নিয়োগপত্রগুলো সরাসরি চেয়ারম্যানের কক্ষে সংরক্ষিত রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট মহলে গুঞ্জন রয়েছে, এই ৬০ জনের নিয়োগের বিনিময়ে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে।
জালিয়াতির আশ্রয় ও নথিপত্র গোপন: দুর্নীতি ঢাকতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিয়োগপত্রে স্মারক নম্বর হিসেবে ৭৪৯ ও ৭৫০ ব্যবহার করা হলেও বোর্ডের মূল স্মারক বইয়ে (ডেসপাস রেজিস্টার) এর কোনো এন্ট্রি নেই। মূলত আইনি জটিলতা এড়াতে এবং তথ্য গোপন রাখতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বোর্ড সচিবের বক্তব্য: নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী জানান, “ফ্যাসিস্ট বিদায়ের পর আমরা শিক্ষা বোর্ডে সংস্কার করতে এসেছিলাম। নিয়ম মেনেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বোর্ড চেয়ারম্যান নিজ ক্ষমতাবলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দিতে পারেন, যা বোর্ড সভায় অনুমোদন সাপেক্ষে হয়। অভিযোগকারীরা সুবিধা করতে না পেরে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।”
চেয়ারম্যান ও অভিযুক্ত মামুনের নীরবতা: এ বিষয়ে কথা বলতে বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর আ খ ম মোফাকখারুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ দিলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, লেনদেনে অভিযুক্ত মামুনকে ফোন করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই সংযোগ কেটে দেন।
বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ: কোনো প্রকার শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই এই ৬০ জনকে নিয়োগ দেওয়ায় বোর্ডের নিয়মিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই নজিরবিহীন অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।