
আবুল হাশেম, রাজশাহী ব্যুরো:
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে জেল খাটা এবং দুদকের একাধিক মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ার পরও কীভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়। সেখানে প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানকে এক নারীর সঙ্গে অত্যন্ত আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর নেটদুনিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ায় আরডিএ-র ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ কামরুজ্জামানের আরডিএ-তে নিয়োগের প্রক্রিয়াটিই ছিল চরম অনিয়মে ঘেরা। ২০০৪ সালে নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ২৪ নম্বর পেয়ে অকৃতকার্য হয়েছিলেন (ন্যূনতম পাস নম্বর ছিল ৩০)। অথচ সেই সময়কার আরডিএ চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লিখিত পরীক্ষাটি বাতিল করে দেন এবং শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।
২০১৬ সালে নিয়োগবঞ্চিতদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে। তদন্তে জালিয়াতির সত্যতা মেলায় ২০১৮ সালে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। ওই মামলায় আরডিএ-র সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আব্দুর রব জোয়ার্দারকেও অভিযুক্ত করা হয়।
২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কারাবরণের পর তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
দুদকের তথ্যানুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী পদে থেকেও কামরুজ্জামান নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজশাহীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় জমি, ফ্ল্যাটসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি পুনরায় স্বপদে ফেরেন। অভিযোগ রয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে কয়েকজন নেতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নেন।
চাকরিতে পুনর্বহাল প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান দাবি করেন, হাইকোর্ট থেকে দুদকের মামলায় তার ওপর ৬ মাসের স্টে-অর্ডার ছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, সেই স্টে-অর্ডারের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও তিনি কোনো নতুন আদেশ ছাড়াই ক্ষমতার দাপটে দেড় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।
আরডিএ-র সাধারণ কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আওয়ামী লীগ আমল হোক বা বিএনপি আমল—সব সময়ই কোনো এক ‘অদৃশ্য শক্তির’ ছায়াতলে থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। একের পর এক নারী কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির প্রমাণ থাকার পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াকে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন তারা।
এ বিষয়ে আরডিএ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ভাইরাল ভিডিওর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত হয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।