
মুহাম্মদ আবু হেলাল, শেরপুর প্রতিনিধি :
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। চারদিকে মৌ মৌ গন্ধে কৃষকের ঘরে নবান্নের আনন্দ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র উল্টো। ফলন ভালো হলেও কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। শ্রমিকের আকাশচুম্বী মজুরি আর বাজারে ধানের দামের ধস—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
ঝিনাইগাতীর জুলগাঁও গ্রামের কৃষক মো. আসাদুল ইসলাম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “একসঙ্গে মাঠের সবার ধান পেকে গেছে। এর মধ্যে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। নিচু জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে তড়িঘড়ি করে কাটতে হচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি এখন দ্বিগুণ। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। অথচ বাজারে এক মণ ধানের দাম মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। ধান ঘরে তুলব কীভাবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
একই চিত্র উপজেলার বালিয়াগাঁও গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায়। কৃষক সাদ্দাম মন্ডল জানান, এবার হালচাষ, সেচ, সার ও কীটনাশকের দাম ছিল অনেক বেশি। গত কয়েক বছরে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে ধানের বাজারমূল্য বাড়েনি। তিনি বলেন, “দোকানের ধার-দেনা ও ঋণের টাকা শোধ করা নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তায় আছি। ধানের দাম না বাড়লে আমাদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাঠভরা পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে প্রকৃতির সাথেও লড়াই করতে হচ্ছে কৃষকদের। অনিয়মিত ঝড়-বৃষ্টি এবং নিম্নাঞ্চলের জমিতে পানি জমে ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকেরা অনেকটা বাধ্য হয়েই বাড়তি মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিচ্ছেন। কিন্তু বাজারের যে দর, তাতে ধান বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধের পর উৎপাদন খরচের বড় একটি অংশই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
মাঠের কৃষকদের দাবি, এখনই সরকারিভাবে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু না হলে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বেন। সরকার নির্ধারিত ন্যায্যমূল্য বাজারে নিশ্চিত করা না হলে অনেক কৃষক আগামীতে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে ঝিনাইগাতীতে প্রায় ১৪ হাজার ৬০৬ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল ও দেশীয় জাতের ধানের আবাদ করা হয়েছে।
তিনি জানান, “এবার ফলন যথেষ্ট ভালো হয়েছে, তবে আবহাওয়ার ঝুঁকি একটা বড় চিন্তার বিষয়। শিলাবৃষ্টি বা আগাম পানিতে ফসলের ক্ষতি এড়াতে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি—জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলে তা দ্রুত কেটে ফেলার জন্য। সরকার ঘোষিত ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম দ্রুত শুরু হলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে তা কেটে যাবে বলে আমরা আশা করছি।”
প্রতিবেদন সারসংক্ষেপ:
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা: ১৪,৬০৬ হেক্টর।
শ্রমিক মজুরি: ১,০০০ – ১,১০০ টাকা।
বাজার মূল্য: ৮০০ – ৯০০ টাকা (প্রতি মণ)।
সরকারি দর: ১,৪৪০ টাকা (আশানুরূপ)।
বাম্পার ফলনের আনন্দ বিষাদে রূপ নেওয়ার আগেই বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় শেরপুরের এই কৃষিপ্রধান জনপদের কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।