
মোঃ বেল্লাল হোসাইন নাঈম, স্টাফ রিপোর্টার: নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সরকারি এই হাসপাতালে সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ। অভিযোগ উঠেছে, খোদ সরকারি হাসপাতাল চত্বরে বসেই রোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে ‘ফি’ নিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া ডিউটি চলাকালীন কর্মস্থল ত্যাগ করে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকার প্রমাণও মিলছে প্রতিনিয়ত।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহিঃবিভাগে রোগীদের উপচেপড়া ভিড় থাকলেও ‘পুষ্টি কর্নার’-এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে দায়িত্ব পালনরত উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার রেজাউল করিমকে তার আসনে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় তার কক্ষের প্রধান চেয়ারটি খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়। অন্যদিকে চিকিৎসার আশায় তীব্র গরম আর ভিড়ের মধ্যে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন অসংখ্য অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনরা।
সেখানে অপেক্ষারত ক্ষুব্ধ রোগীরা জানান, রেজাউল করিম হঠাৎ করেই কাউকে কিছু না বলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। উপস্থিত এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা ডাক্তার সাহেবকে বসার অনুরোধ করলে তিনি আমাদের ওপর উল্টো ক্ষিপ্ত হন এবং অন্য ডাক্তার দেখাতে বলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।” আরেক ভুক্তভোগী নারী আক্ষেপ করে জানান, সংশ্লিষ্ট ওই ডাক্তার প্রায়ই ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে ব্যস্ত থাকেন এবং রোগীদের বসিয়ে রেখে বাইরে চলে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি সরকারি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বাইরের প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক গোপন সূত্র ও ভুক্তভোগী রোগীদের দাবি, বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) ডা. শহীদুল ইসলাম নয়নসহ অধিকাংশ চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালেই রোগী দেখার বিনিময়ে সরাসরি নগদ অর্থ বা ‘ফি’ গ্রহণ করছেন। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা সরকার নির্ধারিত নামমাত্র মূল্যের টিকিটের বিনিময়ে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে তার উল্টো। শুধু তাই নয়, সেবা নিতে আসা সিংহভাগ সাধারণ রোগীদের সরকারি ওষুধ না দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ২ থেকে ৫ হাজার টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপ।
ডিউটি ফাঁকি ও অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার রেজাউল করিমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, হাসপাতালের সার্বিক অব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও কর্মস্থলে চিকিৎসক অনুপস্থিতির বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) ডা. শহীদুল ইসলাম নয়নের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। বরং গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের মুখে তার এমন দায়সারা ও এড়িয়ে যাওয়ার বক্তব্যে স্থানীয় জনমনে আরও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ব্যাপারে নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলা বা কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এক সময়ের সেবামূলক এই সরকারি হাসপাতালটি এখন সাধারণ মানুষের ভরসার বদলে চরম ভোগান্তি ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চাটখিলের সচেতন নাগরিক ও সাধারণ বাসিন্দাদের জোর দাবি, অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন এই পকেটকাটা অব্যবস্থাপনা তদন্ত করে এবং দায়িত্বহীন চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে চাটখিলের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যসেবা পুনরুদ্ধার করে।