
মাহফুজুর রহমান সাইমন, শেরপুর: শেরপুর সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের নতুন বাগলগড় এলাকায় বোনকে কেন্দ্র করে প্রেমের পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব ও অপমানের জেরে বন্ধু আলামিনকে (২২) পরিকল্পিতভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চাঞ্চল্যকর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সাথে ঘটনার সাথে জড়িত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ মে বিকেলে চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের নতুন বাগলগড় গ্রামের সোহেল মিয়ার একটি নেপিয়ার ঘাসক্ষেত থেকে মাথাবিচ্ছিন্ন ও অর্ধগলিত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। পরে মরদেহের পরনে থাকা ট্রাউজার ও জুতা দেখে নিহত যুবককে আলামিন হিসেবে শনাক্ত করেন তার বাবা মো. সাইফুল ইসলাম। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেরপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হলে দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে এর তদন্তভার গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর জামালপুর জেলা ইউনিট। তদন্তে নেমে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পিবিআই জানতে পারে, নিহত আলামিনের এক ডিভোর্সি বোনের সঙ্গে ঘাতক বন্ধু শুভর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ ও চাপা ক্ষোভ চলছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আলামিন একপর্যায়ে শুভকে তার বোনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার জন্য চাপ দেয়। এরই মধ্যে শুভ একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ প্রতিষ্ঠার জন্য আলামিনের কাছে এক লাখ টাকা ধার চায়। তখন আলামিন টাকা দেওয়ার পাল্টা শর্ত হিসেবে শুভর বোনকে কাছে পাওয়ার কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। নিজের বোনের প্রতি এই ধরণের ইঙ্গিত ও আচরণে চরম অপমানবোধ করে শুভ এবং আলামিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে।
১০ হাজার টাকায় খুনি ভাড়া:
নিজের প্রতিশোধের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে শুভ তার সহযোগী সম্রাটকে মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতে রাজি করায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৩ মে দুপুরে আলামিনকে অন্য এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে কৌশলে নির্জন নতুন বাগলগড় এলাকার ঘাসক্ষেতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আলামিন অসচেতনভাবে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকাকালে শুভ আচমকা পিছন থেকে নাইলনের দড়ি আলামিনের গলায় পেঁচিয়ে ধরে টান দেয়। এ সময় সহযোগী সম্রাট আলামিনকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখে যাতে সে নড়াচড়া করতে না পারে। ছটফট করা অবস্থায় শুভ তার সঙ্গে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে আলামিনকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তারা মরদেহটি গভীর ঘাসক্ষেতে ফেলে রেখে অত্যন্ত গোপনে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পিবিআই জানায়, ছায়া তদন্তের সূত্র ধরে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে প্রধান আসামি শুভকে শেরপুরের বাগলগড় গুচ্ছগ্রাম এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে জামালপুর সদর উপজেলার পাথালিয়া সন্ধিক্লাব এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী সম্রাটকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের দেখানো স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং নাইলনের রশি জব্দ করেছে পুলিশ।
পরবর্তীতে আসামিদের শেরপুর আদালতে হাজির করা হলে প্রধান আসামি শুভ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মূল মালিক শান্তও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এই সফল অভিযান প্রসঙ্গে পিবিআই জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত বলেন, “নৃশংস এই ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পরপরই পিবিআই-এর পৃথক টিম গঠন করে ছায়াতদন্ত শুরু করা হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও আমাদের সদস্যদের নিরলস পরিশ্রমে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লু-লেস এই হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।” মামলার তদন্ত কার্যক্রম ও আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।